একদা" পশ্চিমবঙ্গ ছিল ভারতের প্রধান শিল্প কেন্দ্র, যা ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় দেশের শিল্প জিডিপিতে (GDP) প্রায় ২৭% অবদান রাখত। এটি ছিল চট (পাট), কয়লা, চা এবং ভারী প্রকৌশল—এই চারটি প্রধান সাম্রাজ্যিক শিল্পের কেন্দ্রস্থল এবং প্রায় সমস্ত অর্থনৈতিক সূচকে শীর্ষে ছিল।
ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলা ভারতের উৎপাদন খাতের নেতৃত্ব দিয়েছে।
পাটের রাজধানী: হুগলি নদীর তীরে পাটের কলের বিশাল সমাবেশ ছিল, যা ভারতের মোট কাঁচা পাটের ৮০%-এরও বেশি উৎপাদন করত এবং একে শিল্পের "ঐতিহ্যবাহী মেরুদণ্ড" বলা হতো।
এশিয়ার শেফিল্ড: বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বব্যাপী ঢালাই শিল্প এবং লৌহজাত পণ্যের কেন্দ্র হিসেবে অভাবনীয় উন্নতির কারণে হাওড়া শিল্পাঞ্চল এই নাম অর্জন করেছিল।
ভারী প্রকৌশলে অগ্রণী: এই রাজ্যেই ভারতের প্রথম বড় লৌহ ও ইস্পাত কারখানা (যেমন ১৯১৮ সালে ইসকো স্টিল প্ল্যান্ট) এবং প্রথম টেলিযোগাযোগ কেবল ইউনিট (১৯৫২ সালে হিন্দুস্তান কেবলস) স্থাপিত হয়।
বিশ্বব্যাপী চায়ের কেন্দ্র: দার্জিলিং চা বা "চায়ের শ্যাম্পেন" একটি বিশ্ববিখ্যাত রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়, যার পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয়েছিল ১৮৪০-এর দশকেই।
এই যুগে বেশ কিছু কিংবদন্তি ভারতীয় ব্র্যান্ডের জন্ম হয়েছিল বাংলায়:
বোরোলিন (১৯২৯): একটি অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম যা ভারতের ঘরে ঘরে একটি অপরিহার্য "সুপারব্র্যান্ড" হয়ে ওঠে।
ব্রিটানিয়া (১৮৯২): ভারতের অন্যতম প্রাচীন কোম্পানি, যা ১৯২১ সালেই গ্যাস ওভেনের সাহায্যে উৎপাদন বৃদ্ধি করেছিল।
সারেগামা/এইচএমভি (১৯০১): ভারতীয় সঙ্গীত শিল্পের পথপ্রদর্শক, যা কলকাতায় ইএমআই (EMI)-এর প্রথম বিদেশি শাখা চালু করেছিল।
বেঙ্গল কেমিক্যালস: প্রফুল্লচন্দ্র রায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এটি ছিল ভারতের প্রথম ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি।
১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ এবং ১৯৭০-এর দশকে বেশ কিছু কারণে রাজ্যের এই আধিপত্য কমতে শুরু করে:
শ্রমিক অসন্তোষ: উগ্র ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন এবং ঘন ঘন ধর্মঘটের ফলে ২২,০০০-এরও বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন: শিল্পায়নের এই ভাটার যুগে বিড়লা এবং সিংহানিয়ার মতো বড় কোম্পানিগুলো তাদের কার্যক্রম মহারাষ্ট্র ও দিল্লির মতো অন্য রাজ্যে সরিয়ে নিতে শুরু করে।
অর্থনৈতিক সংকোচন: ১৯৯৮ সালের মধ্যে ভারতের মোট শিল্প উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গের অংশ ৫%-এর নিচে নেমে আসে।
আজ ঐতিহ্যবাহী চট ও চা শিল্প টিকে থাকলেও, রাজ্যটি সল্টলেকের আইটি (IT) হাব, হলদিয়ার পেট্রোকেমিক্যালস এবং উদীয়মান সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব্রিকেশন প্রকল্পের ওপর ভিত্তি করে একটি "দ্বিতীয় অধ্যায়" বা নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।